সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসে রাষ্ট্রনায়কের অভাব হয়নি; কিন্তু মদিনার শাসনব্যবস্থায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যেভাবে তাওহিদ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সর্বজনীন মানবিকতার অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন তা ইতিহাসের পাতায় এক নজিরবিহীন অধ্যায়। মক্কায় দীর্ঘ ১৩ বছর ঈমান ও তাওহিদের শিক্ষা দেওয়ার পর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। এই হিজরত কেবল ভূখণ্ড পরিবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের সূচনা। মদিনা সনদ ও সহাবস্থানের প্রবর্তন মদিনায় পৌঁছানোর পর মহানবী (সা.) প্রথম কাজ হিসেবে মসজিদ নির্মাণ করেন, যা একাধারে ইবাদতখানা, বিচারালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এরপর মক্কা থেকে আগত ‘মুহাজির’ ও স্থানীয় ‘আনসারদের’ মাঝে ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বহুধর্মী ও বহু গোত্রে বিভক্ত সমাজকে সুসংগঠিত করতে তিনি ৪৭টি ধারাসংবলিত পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন করেন। এই সনদে মুসলিম, ইহুদি ও অমুসলিমদের নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বহিরাগত শত্রুর হাত থেকে মদিনাকে যৌথভাবে রক্ষার সার্বজনীন অঙ্গীকার নিশ্চিত করা হয়।
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ মানদণ্ড রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশাসনিক কাঠামোর প্রাণকেন্দ্র ছিল চরম নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন। কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী—‘মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করো’ (সূরা আন-নিসা: ৫৮)। আইনের দৃষ্টিতে ধনী-দরিদ্র কিংবা বংশীয় মর্যাদার কোনো পৃথক মানদণ্ড ছিল না। কুরাইশ বংশের সম্ভ্রান্ত এক নারী চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হলে তার পক্ষে সুপারিশ আনা হয়। তখন মহানবী (সা.) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম’ (সহীহ বুখারী)।
গণতান্ত্রিক চর্চা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে মহানবী (সা.) ‘শুরা’ বা পারস্পরিক পরামর্শকে রাষ্ট্রের মূলনীতি বানান (সূরা আশ-শুরা: ৩৮)। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তগুলোতে তিনি সাহাবিদের মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
অর্থনৈতিক নীতিতে জাকাত ব্যবস্থা চালু, সুদের সম্পূর্ণ বিলোপ এবং ঘুষ, প্রতারণা ও অবৈধ সম্পদ পাচার নিষিদ্ধ করা হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদকে জনগণের আমানত হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’ (সহীহ মুসলিম)।
দূরদর্শী কূটনীতি ও ক্ষমাশীলতার শীর্ষ দৃষ্টান্ত হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর শর্ত মেনে নিয়ে যে ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্য দেখান, পবিত্র কুরআন তাকে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ (সূরা আল-ফাতহ: ১) বলে আখ্যা দেয়। পরবর্তী সময়ে অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দিন পরম শত্রুদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। কিসাস বা প্রতিশোধের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মহানুভবতার এই দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রাষ্ট্রচিন্তার মূল নির্যাস ছিল কেবল ক্ষমতার চর্চা নয়; বরং মানবাধিকার রক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, দুর্বলদের সুরক্ষা এবং চুক্তির প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাবোধ রাখা। যার কারণে কুরআনে তাঁর প্রশংসায় বলা হয়েছে—‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী’ (সূরা আল-কলম: ৪)।


