ব্রাদারহুড ও কালো তালিকা প্রসঙ্গ

মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল আল বান্নার হাতে সাংগঠনিক রূপ পায়। বর্তমান নেতা মোহাম্মদ বদি এর অষ্টম জেনারেশনের নেতা। মিসরের আবদেল ফাত্তাহ সিসি সরকার তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা দায়ের করেছে। ফরমায়েশি আদালত তাকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। তবে অনেক মামলায় তিনি বেকসুর খালাসও পেয়েছেন। মুসলিম ব্রাদারহুড বা ইখওয়ানুল মুসলেমীন বাহরাইন, ইরান, তুরস্ক, ইরাক, ইসরাইল, ফিলিস্তিন, জর্দান, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, সিরিয়া, আরব আমিরাত, ইয়েমেন, আলজেরিয়া, লিবিয়া, মৌরিতানিয়া, মরক্কো, সোমালিয়া, সুদান, তিউনিসিয়া, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় সক্রিয়। ইউরোপের জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে ব্রাদারহুড ইসলাম ও রাজনীতির ওপর প্রকাশ্যে মত প্রকাশ এবং বিভিন্ন প্রকাশনা করে থাকে। মুসলিম ব্রাদারহুডের বহুল প্রচলিত স্লোগান হলো- ‘ইসলামই সমাধান’ এবং ‘বিশ্বাসীরা ভাই ভাই’।

জানা যায়, কোনো দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা এবং জনগণের চাহিদা বিশ্লেষণ করে ব্রাদারহুড তাদের করণীয় নির্ধারণ করে। যেমন- কুয়েত আর জর্দানে ‘সহযোগিতা ও সরকারে অংশগ্রহণমূলক নীতি, মিসরে ‘শান্তিপূর্ণ অবরোধ ও বিরোধিতা’, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ প্রভৃতি তার গৃহীত নীতি। ব্রাদারহুডের নীতি ও কার্যধারা কেমন হবে সেটি ড. ইউসুফ আল কারজাভী তার বই Towards a Worldwide Strategy for Islamic Policy-তে উল্লেখ করেছেন। সেটাকে ব্রাদারহুডের ১২ দফা বা সংক্ষেপে ‘প্রজেক্ট’ বলে অভিহিত করা হয়। ১৯৮২ সালে ব্রাদারহুডের নীতিমালা সুইজারল্যান্ড থেকে ঘোষিত হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের বাইরে অবস্থানকালে ব্রাদারহুডের কর্মীদের সে দেশের মূল নীতিমালার বিরোধী কোনো পদক্ষেপ না নেয়ারও নির্দেশনা ড. কারজাভী বইতে উল্লেখ করেছেন। কিছু পশ্চিমা মূল্যবোধ ইসলামী নীতিমালার আলোকে গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়নি। উদ্দেশ্য, পশ্চিমা জগতের সাথে যেন ইসলামের দ্বন্দ্ব বেড়ে না যায়। কারণ, তা হলে ইউরোপে ইসলাম প্রচার বিঘ্নিত হবে।

মুসলিম ব্রাদারহুড একটি বহুজাতিক সংগঠন, রাজনীতি করে ক্ষমতারোহণ তাদের কাছে মুখ্য নয়। তবে এর সদস্যরা বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক সংগঠনও গঠন করেছেন। যেমন- ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্ট জর্দানে, হামাস গাজায় ও পশ্চিম তীরে, ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি মিসরে। এসব সংগঠনে ব্রাদারহুড কর্মীরাই দল পরিচালনা করেন। অনেকে ব্রাদারহুডকে ‘নব্য-সুফি তরিকা’ এবং হাসান আল বান্নাকে ‘মুর্শিদ’ বলে অভিহিত করেন। মিসরের ব্রাদারহুডে পরিবার বা উসরা পদ্ধতি রয়েছে, চার থেকে পাঁচজন সদস্য নিয়ে উসরা গঠিত। এর একজন নেতা থাকেন, যাকে বলা হয় নকিব। নেতৃত্বে অনেক স্তর রয়েছে- মুহিব, মুনতাসিব, মুনতাসিম ইত্যাদি। এসব স্তরে উত্তরণ করতে অনেক বিশ্বস্থতা, যোগ্যতা, জ্ঞানার্জন ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। পাশাপাশি, নেতারা পর্যবেক্ষণ করে এসব সদস্যের যোগ্যতা পরীক্ষা করে মূল্যায়ন করে থাকেন। অনেক সময় পরিবার ও দেশ ছেড়ে কোনো কোনো দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হয়। দেখা গেছে, ব্যক্তিগতভাবে অসৎ ও অনৈতিক কোনো ব্যক্তির পক্ষে ব্রাদারহুডে উচ্চাসনে যাওয়া সম্ভব হয় না।

সর্বোচ্চ পর্যায়ে নীতিনির্ধারণ করা হয় মকতব আল ইরশাদের মাধ্যমে। ওখানে ১৫ জন সদস্য রয়েছেন। তারা সবাই দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন। এর নিচে শূরা কাউন্সিল। সেখানে প্রায় ১০০ জন সদস্য। তারাই মূল কার্যনির্বাহী। কোনো ইসলামী স্কলারের পক্ষে হুট করে সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। বলা যায়, ইসলামের রাজনৈতিক সত্তাকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টার কারণে পশ্চিমা বিশ্ব ব্রাদারহুডের ওপর বেজায় নারাজ। তাই ওই সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ বানাতে তারা বদ্ধপরিকর।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম ব্রাদারহুডকে ঢালাওভাবে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যায়িত করতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র চায় না। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনীতি জটিলতর হবে। সবাই না হলেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিনেটর ও রাজনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে হয়েছে। ওই মতের সেরা প্রবক্তা হলেন রেক্স টিলারসন।

কাতার ব্রাদারহুডকে সমর্থন করায় সৌদি আরব ক্ষুব্ধ হয়েছে। ‘হাউজ অব সৌদ’ সবসময় নিজেদের সমালোচনা বলে ও বিপক্ষকে কণ্ঠরোধ করতে চায় অভিযোগ। সৌদিরা ব্রাদারহুডকে কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব-নিকাশ অন্যরকম। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ভবিষ্যৎ শক্তিগুলোকে বারবার পরখ করে এবং চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিতে। এ কারণে সৌদি চাপ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্রাদারহুডকে ঢালাওভাবে কণ্ঠরোধ করতে এগিয়ে আসেনি। টিলারসন মনে করতেন, ব্রাদারহুড বিস্তৃত এক সংগঠন, যার সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ৫০ লাখের ওপর। তাদের একচেটিয়া ‘সন্ত্রাসী সংগঠন বলে রাজনীতির মঞ্চকে উত্তপ্ত করা যাবে, কিন্তু পরে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হবে, তা উত্তরণে যুক্তরাষ্ট্রকে উল্টো পথে চলতে হবে। তাতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি হারাবে ভারসাম্য। ব্রাদারহুডকে সমর্থন দিচ্ছেন, মুসলিম বিশ্বে এমন দেশ ও নেতা রয়েছে। ব্রাদারহুডের ভেতরেই নামকরা বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, স্কলার, ব্রডকাস্টার রয়েছেন। তাই টিলারসন সাবধানে পা ফেলার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে সরকারের ভেতর ব্রাদারহুডের কর্মকর্তা আছেন। তারা একজন সরকারপন্থী হিসেবে নিরপেক্ষভাবে ও দুর্নীতিমুক্তভাবে দেশের সেবা করে যাচ্ছেন এবং তাদের চারিত্রিক উৎকর্ষ ও প্রজ্ঞা অন্যদের চেয়ে বেশি। তাই আমেরিকার বুদ্ধিজীবীরা ঢালাওভাবে এসব ব্রাদারহুডপন্থীর মাথার ওপর অবমাননাকর খড়গ তুলে দিতে চান না। উদাহরণস্বরূপ- বাহরাইন ও তুরস্কের দিকে ওয়াশিংটন আঙ্গুল তুলে দেখায়। আবার জর্দানের জনগণ ব্রাদারহুডকে পছন্দ করে বেশি। কখনো জর্দানে সরকারের পতন হলে ব্রাদারহুডই ক্ষমতায় আরোহণ করবে। তাই জর্দানে জনগণের রোষ উৎপন্ন হয় এমন কিছু পাশ্চাত্য করতে চায় না।
আরব বিশ্বে মুসলিম ব্রাদারহুড সবচেয়ে পুরনো ইসলামী দল। কোনো কোনো দেশে সরকারিভাবে এ দলকে নিষিদ্ধ করা হলেও তাদের ভিন্ন নামে অনেক শাখা বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এ দিকে বাহরাইন, মিসর, রাশিয়া, সৌদি আরব, সিরিয়া ও আরব আমিরাত ব্রাদারহুডকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সৌদি আরব ২০১৩ সালে ব্রাদারহুডকে নিষ্ঠুরভাবে দমনের সময় মিসরকে ব্যাপক সহায়তা দেয় এবং ২০১৪ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

আন্তর্জাতিক পাশ্চাত্যের বিশ্লেষকরা বলেছেন, সুন্নি মুসলমান যারা সরকার ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রবেশ করতে চায়, তাদের মধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের মডেল সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। ধর্মের নামে রাজনীতি না করে রাজনীতিকে কল্যাণ ও ধর্মীয় আবহে রূপান্তরের জন্য ব্রাদারহুড যেন লৌহ ইস্পাতের দেয়াল। সবচেয়ে বড় কথা, সব ধরনের ভণ্ডামি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই দল সোচ্চার বলে দেখা গেছে। মনে করা হয়, জনগণের সম্পদ তাদের হাতে শোষিত হবে না।

পশ্চিমা বিশ্ব ‘ইসলাম’ বলতে সৌদি আরবের দিকে তাকায়। ইসলাম বলতে শেখতন্ত্র, রাজা-বাদশাহ, মহিলাদের ঘরে বন্দী রাখা- এমন এক সমাজের কথা চিন্তা করে। ব্রাদারহুড গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মার্কিন চিন্তানায়কদের অনেকে ব্রাদারহুডকে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় আমেরিকার সহযাত্রী হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। পশ্চিমা অনেক পণ্ডিত মনে করেন, বলতে গেলে ব্রাদারহুডই ইসলামের প্রকৃত রূপ পশ্চিমা বিশ্বে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের Schengen Information System (SIS)-এর ২০১৮ সালের এক রিপোর্টে জানা যায়, ফ্রান্সে ৭৮ হাজার ৬১৯, যুক্তরাজ্যে ১৭ হাজার এবং জার্মানিতে চার হাজার অ্যাক্টিভিস্টকে শনাক্ত করা হয়েছে যাদের বেশির ভাগ মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য। সংস্থা মনে করে, তারা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। কিন্তু ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো মারাত্মক অপরাধের বিবরণ পাওয়া যায়নি। তার পরও ইউরোপের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য তাদের দায়ী করা হচ্ছে। ফ্রান্সের ক্রিশ্চিনা তাসিন হলেন এর অন্যতম প্রবক্তা। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমাদের দণ্ডবিধি নেপোলিয়ান বানিয়েছিলেন, তিনি মূলত রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ানের অনুসরণ করেছিলেন। আমাদের ইংরেজদের মতো হেবিয়াস করপাসের ঐতিহ্য নেই। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চক ও পনিরের মতো সব আপন করে নিচ্ছে।’

তবে অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশের চেয়ে ফ্রান্সে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব বেশি। বেশির ভাগ মুসলমান কোনো গুরুতর অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত না হলেও পান থেকে চুন খসলেই তাদের ধরে জেলে ঢুকানো হচ্ছে। মুসলমানরা ফ্রান্সের রাস্তায় বা পার্কে নামাজ পড়লে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, আজান দিলে ‘অসুবিধা হচ্ছে’, ধর্ম প্রচার করলে অস্বস্তি হচ্ছে, মেয়েরা হিজাব পরলে সমস্যা হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে নানা ইসলাম আতঙ্কমূলক আইন প্রণয়ন করে মুসলমানদের ঢুকানো হচ্ছে জেলে। জেলখানায় হালাল খাবার সরবরাহ তালিকা পরীক্ষা করে দেখা যায়, ফ্রান্সের জেলখানার ৮০ শতাংশ কয়েদি মুসলমান! ২০ হাজার কয়েদিকে ইসলামী জাগরণের কর্মী, ব্রাদারহুড ও উগ্রপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউরোপীয় আর কোনো দেশে এত বেশি সংখ্যায় কয়েদি নেই। এ জন্য চরমডানপন্থী ও সমকামী গোষ্ঠীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তৎপর। এরা সরকারকে সতর্ক করেছে এই বলে যে, ফ্রান্স নীরবে ‘ইসলামীকরণের’ দিকে ধাবিত হচ্ছে। মিসেস তাসিন দাবি করেন ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের কারণে ফ্রান্স ইসলামীকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’ এ বিষয়টাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করছে ইসরাইলি গোয়েন্দারা। তারা সম্প্রতি একটি ডকুমেন্টারি ছেড়েছে The silent jihad নামে। ধারণা করা হচ্ছে, ক্রিশ্চিনা ইসরাইলের বা মোসাদের ভাড়া করা কর্মী। মুসলিম ব্রাদারহুডের সংগঠন ইউনিয়ন অব ইসলামিক অর্গানাইজেশন অব ফ্রান্স সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে থেকে ইসলামের জন্য কাজ করছে।

মহিলাদের পর্দা, হালাল খাবার, রমজান প্রতিপালন, মুসলমান কর্তৃক শরিয়াহ আইন লঙ্ঘিত না হওয়া, মহিলাদের সাথে করমর্দন না করা, কুরআনে উল্লিখিত জিহাদ ও অবিশ্বাসীদের বিষয় সম্পর্কে বর্ণিত আয়াতগুলোর তাৎপর্য তুলে ধরা- এসব বিষয় নিয়ে ব্রাদারহুড চার দশক ধরে কাজ করছে। ইসলামের প্রসার ঠেকাতে ফ্রান্স সরকারের অপারগতায় ইসরাইলি মোসাদ এগিয়ে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, প্যারিসের উমর মসজিদে ইমাম খুতবায় জিহাদের বর্ণনা দেয়ার সময় মুসলিম বেশধারী ইহুদি গোয়েন্দা রেকর্ড করে তা পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে দেয়। এত সবের পরও ফ্রান্স সরকার ইসলামের ও ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে কোনো আইন ও ব্যবস্থা না নেয়ায় নাস্তিক, সমকামী ও ইসলামবিরোধী সংগঠনগুলো সরকারের সমালোচনার জন্য বহির্বিশ্বে ইসলামবিরোধী মিডিয়ার ওপর ভর করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন জাতীয় নিরাপত্তা পরামর্শক লরা পিটার বলেছেন, ব্রাদারহুডকে কালো তালিকাভুক্ত করলে সংগঠনের একনিষ্ঠ কর্মীরা আলকায়দা বা আইএসের মতো সংগঠনে যোগ দিয়ে পরিস্থিতি ভারী করে তুলতে পারে। তা ছাড়া ব্রাদারহুডের অনেক কর্মকাণ্ড রয়েছে যা আইনানুগ, মানবিক ও সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওই সব বিষয়কে বেআইনি কাজের খাতায় তুলে রাখা সম্ভব নয়। তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হলে তাদের সাথে যেসব ব্যক্তি, সংস্থা ও রাষ্ট্র সম্পর্ক রাখে, তারাও নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হবে। এ বিষয়টি আরো মারাত্মক।

ব্রাদারহুড আন্তর্জাতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক মুভমেন্ট হিসেবেও বিবেচিত। অনেক স্বাধীন রাজনৈতিক দল ও দাতা সংস্থা তাদের সাথে সংযুক্ত। এসব শাখা ওই দেশের রাজনীতি, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরো বড় একটি প্রতিবন্ধকতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, উত্তর আফ্রিকা, জর্দান ও তিউনিসিয়ায় মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত রাজনৈতিক দল রয়েছে, সেখানে মুসলিম ব্রাদারহুড আইনসিদ্ধ এবং, তাদের সংসদ সদস্য রয়েছে। এসব দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সম্পর্ক ও চুক্তি বলবৎ রয়েছে। ব্রাদারহুড তুরস্ক, কাতার, যুক্তরাজ্যসহ অনেকে দেশে অফিস খুলে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বৈধভাবে। যুক্তরাষ্ট্রে ব্রাদারহুডের কোনো অফিস নেই, কিন্তু কর্মী আছে। কংগ্রেসে ও ট্রাম্প প্রশাসনে বারবার এ প্রস্তাব ঠেলে দেয়া হচ্ছে যে, ব্রাদারহুড এখন আমেরিকার রাজনীতিতে প্রবেশের এবং আমেরিকার বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ জন্য ট্রাম্প প্রশাসন শঙ্কিত। আমেরিকার স্বার্থের ওপর কোনো ‘ভায়োলেন্স’ এলে ট্রাম্প চরম ব্যবস্থা নিতে কুণ্ঠা বোধ করবেন না, আর ব্রাদারহুড ভুলেও আমেরিকায় ওই পথ মাড়াবে বলে মনে হয় না।

যদি বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ব্রাদারহুডকে তালিকাভুক্ত করা হয়, তবে শুধু তাদের সদস্য নয়, আমেরিকা বা বিদেশে যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থা তাদের সাথে সম্পর্ক রাখলে, সহায়তা বা কোনো সম্পদ দান করলে তারাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত হতে এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে পারে। তা ছাড়া, এবং তাদের প্রচলিত বিভিন্ন আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যাবে।

অস্থির আরব বিশ্বে একমাত্র ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত, ব্রাদারহুডের রয়েছে গণতান্ত্রিকভাবে সরকার গঠনের ক্ষমতা ও সংগঠিত লোকবল। তাদের সংগঠন ও কার্যক্রমে কোনো উগ্রতা নেই বলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে। আরব বিশ্বে কোনো দেশের শেখতন্ত্র বা নেতা পরিবর্তনের জন্য ডাক দেয়ার শক্তি-সামর্থ্য ব্রাদারহুডের রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই তাদের মত পরিবর্তন করে ব্রাদারহুডের সাথে হাত মেলাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় এবং আরব দেশগুলোতে শান্তি ও উন্নতির জন্য জনগণের শক্তির সাথে বাহুবন্ধন করতে মুসলিম ব্রাদারহুডকে যেকোনো সময় বাছাই করে নতুন পথনির্দেশনায় সহায়তা করতে পারে বলে মনে করা যায়।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares