ফণীতে কৃষকের বড় ক্ষতির আশঙ্কা

বহির্বিশ্বে একসময় বাংলাদেশের পরিচয় ছিলো ঘূর্ণিঝড়, বন্যা আর দুর্ভিক্ষের দেশ হিসেবে। সেসব দিন আমরা পার করে এসেছি বহু আগে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত দক্ষ। সরকারেরও উদ্যোগ বেড়েছে আগের তুলনায়। ফলে সারা পৃথিবীতে দুর্যোগ মোকাবিলায় রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশ।

আমরা কি আমাদের সেই সক্ষমতা আবার দেখাতে পারবো? অস্বাভাবিক আকার ধারণ করে বঙ্গোপসাগরে প্রবল শক্তি সঞ্চয় করছে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’। ভয়ঙ্কর রূপে এই শক্তির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাণ্ডবলীলা দেখাতে পারে এই ঝড়।

বলতেই পারেন কতো ঝড়ই তো আসে-যায়। আলাদা করে দুশ্চিন্তার কী আছে? সম্ভবত আছে। কেননা, এবার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন।

ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঘূর্ণিঝড়-পরিসংখ্যান বলছে গত ৪৩ বছরে অর্থাৎ ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এপ্রিল মাসে বঙ্গোপসাগরে যতোগুলো ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে, তার কোনোটি কখনই এতো শক্তিশালী আকার ধারণ করেনি।

তাদের মতে ১৯৬৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরে মোট ৪৬টি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি ঝড়ের সৃষ্টি হয়েছিল অক্টোবর-নভেম্বর মাসে। এছাড়া সাতটি মে মাসে এবং ১৯৬৬ ও ১৯৭৬ সালে মাত্র দুটি ঝড় সৃষ্টি হয় এপ্রিল মাসে। প্রত্যেক বছর বিশ্বে মাত্র ২০ থেকে ৩০টি ঘূর্ণিঝড় এ ধরনের প্রবল শক্তি সঞ্চয় করে আছড়ে পড়ে।

গত শতকের শেষের দিকে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে নিহতের সংখ্যা বিচারে পৃথিবীর ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল রাতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানা এ ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়টিতে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিলো ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিমি (১৫৫ মাইল/ঘণ্টা)। প্রলয়ঙ্কারী সেই ঘূর্ণিঝড় এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলবর্তী জেলাগুলোতে প্রথম ধাক্কায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৬ জন। মারা যায় ২০ লাখ গবাদি পশু। গৃহহারা হয়েছিলেন ৫০ লাখ মানুষ।

আর এই শতকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘সিডর’। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর জলোচ্ছ্বাসসহ প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ বাংলাদেশে আঘাত হেনেছিলো। ঘূর্ণিঝড়টির সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার।

তারপরও বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। যেমন ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে ‘রশ্মি’, ২০০৯ সালের মে মাসে ‘আইলা’, ২০১৩ সালের মে মাসে ‘মহাসেন’, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ‘কোমেন’, ২০১৬ সালের মে মাসে ‘রোয়ানু’ এবং ২০১৭ সালের মে মাসে ‘মোরা’। কিন্তু, ‘আইলা’ ছাড়া বাকিগুলো তেমন বিধ্বংসী ছিলো না।

এবার তুলনামূলক বিশ্লেষণে আসি- ‘গোর্কি’ আর ‘সিডর’- এ দুটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিলো দুটি ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন সময়ে। তাই ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতাও ছিলো ভিন্ন।

‘গোর্কি’ আঘাত হানে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা বিশেষত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে। এই অঞ্চলে বড় কোনো বনাঞ্চল না থাকার কারণে শুধু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় মারা যান যথাক্রমে ৭৭ হাজার ও ৪০ হাজার মানুষ।

অন্যদিকে, ‘সিডর’ আঘাত হানে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে সুন্দরবনের ওপর। বাংলাদেশে ‘সিডর’ প্রায় ১২ ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিলো। যেহেতু ‘সিডর’ আঘাত হেনেছিলো সুন্দরবনে তাই প্রাণহানির সংখ্যা ছিলো তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কারণ সুন্দরবন বা প্যারাবনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে জৈবঢাল হিসেবে ভূমিকা রাখা। বন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যেহেতু তাকে প্রথম আঘাতটা সইতে হয়েছে। সুন্দরবন পরম মমতায় আগলে রেখেছিলো লাখ লাখ মানুষকে। আমাদেরকে শিখিয়েছিলো সুন্দরবনের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপকতা ও গুরুত্ব।

আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়। নাম ‘ফণী’। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে- পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল এ ঘূর্ণিঝড় আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ৩ মে বিকালে ভারতের উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এরপর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে সন্ধ্যার দিকে খুলনাসহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে পৌঁছাতে পারে।

তবে বর্তমান গতিপথ ঠিক থাকলে এ ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চলে দেখা দিতে পারে ৩ মে সকাল থেকেই।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আশার কথা হলো ভারতের খড়গপুরের পরে ‘ফণী’ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের রূপ নেবে যার গতিবেগ থাকবে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৮৫ কিলোমিটার। এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক। তাই আতঙ্কিত না হয়ে মনোবল শক্ত রেখে সঠিক প্রস্তুতি নিতে হবে।

খারাপ লাগছে কৃষকের জন্যে। তার খেত ভরা ধান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আব্দুল মুঈদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২১ শতাংশের মতো ধান কাটা হয়েছে। আমরা পরামর্শ দিয়েছি খেতে ধান যদি ৮০ শতাংশ পেকে যায় তাহলেও কৃষক যেনো তা কেটে ফেলেন।’ কিন্তু, বাস্তবতা হলো এতো অল্প সময়ের মধ্যে এতো ধান কেটে কোনো অবস্থাতেই ঘরে তোলা সম্ভব নয়। তার মানে কৃষকের ক্ষতির একটা বড় আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

‘ফণী’ তার ফণা কতোটুকু তুলে কৃষকের কতোটা ক্ষতি করতে পারবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares