তুর্কি অভিযান ঠেকাতে মানবিজে সিরীয় বাহিনী

সিরিয়ার মানবিজ শহরে প্রবেশ করেছে দেশটির সরকারি বাহিনী। তুর্কি অভিযান মোকাবেলায় সহায়তা করতে সশস্ত্র কুর্দি সংগঠনগুলোর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে এ পদক্ষেপ নিয়েছে সিরীয় সরকার। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা জানিয়েছে, শুক্রবার মানবিজে সিরীয় পতাকা উড়িয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী।

সম্প্রতি সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার পর কুর্দি নিয়ন্ত্রণাধীন মানবিজ অঞ্চলে ঢুকে পড়ে তুরস্কের সেনাবাহিনী। কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দেয়া হয়। তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা আনাদোলুর খবর থেকে জানা যায়, দেশটির সেনা সদস্য ও সরঞ্জাম বহনকারী ট্রাক, দুটি ট্যাংক ও অন্য সাঁজোয়া যান মঙ্গলবার মানবিজের পশ্চিমাঞ্চলীয় আরিমাহ গ্রামে ঢুকে পড়ে। মানবিজের কেন্দ্রস্থল থেকে গ্রামটির দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার।

‘তুর্কি অভিযান’ ঠেকাতে সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারের সহায়তা চায় কুর্দি সংগঠন ওয়াইপিজি (পিপল’স প্রটেকশন ইউনিট)। এর পর পরই মানবিজে সিরীয় সরকারি বাহিনী প্রবেশ করে। ওড়ানো হয় সিরীয় পতাকা। সানার খবর থেকে জানা গেছে, মানবিজে অবস্থানরত সিরীয় নাগরিক ও অন্যদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে সিরিয়ার সেনাবাহিনী।

মানবিজের নিয়ন্ত্রণ মূলত কুর্দি সংগঠন ওয়াইপিজি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সের (এসডিএফ) হাতে। সিরিয়ায় আইএস বিরোধী যুদ্ধে ওয়াইপিজি নেতৃত্বাধীন এসডিএফকে বহুদিন ধরেই সমর্থন দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন। তবে কুর্দিদের বিরুদ্ধে তুরস্কের অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। দেশটি কুর্দিদের সন্ত্রাসী মনে করে। আঙ্কারার দাবি, সিরিয়ায় কুর্দিদের সংগঠন ওয়াইপিজি আসলে তুরস্কে কুর্দিদের নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন পিকেকের শাখা।

কুর্দি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পিকেকে তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার অংশবিশেষ নিয়ে কুর্দিস্তান নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। তিন দশক ধরে তুরস্কের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে পিকেকে। ১৯৮৪ সাল থেকে এ বিদ্রোহে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। গত ১৯ ডিসেম্বর সিরিয়া থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মানবিজে টহলে থাকা মার্কিন সেনারা এখনো সেখানে আছে নাকি তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জানা যায়নি মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতিক্রিয়াও।

মনস্তাত্তিক অভিযান : এরদোগান
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান বলেছেন, সিরিয়া মানবিজে সেনা পাঠিয়ে একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক’ অভিযান চালাচ্ছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তুরস্কের লক্ষ্য হচ্ছে ওয়াইপিজি/পিকেকে গ্রুপকে শিক্ষা দেয়া আর আমরা তা করতে প্রস্তুত রয়েছি। তিনি আরো বলেন, এই সন্ত্রাসী গ্রুপ সিরিয়া থেকে হটে গেলে তুরস্কের আর কিছু করার নেই। তুরস্ক সিরিয়ার বিভক্তির বিরোধী।

ট্রাম্পের ফোনকলে পাল্টে গেল সব কিছু
প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাথে ট্রাম্পের এক ফোনকলে সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা সরানোর ঘোষণায় পাল্টে গেল তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের মানবিজ রণক্ষেত্রের চিত্র। দুই সপ্তাহ আগের ওই ফোনকলে ট্রাম্প সীমান্তের ওপারে মার্কিন সমর্থিত কুর্দি বিদ্রোহী বাহিনীর ওপর হামলা পরিকল্পনার জন্য এরদোগানকে হুঁশিয়ারি জানাবেন বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা না করে সিরিয়া থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করার কথা ঘোষণা করেন। সিরিয়ার এক-চতুর্থাংশ অঞ্চলে আইএসকে হটানোর দায়িত্ব তুরস্কের ওপর ছেড়ে দেন।

ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস ও আইএসবিরোধী যুদ্ধে সমন্বয়কারী কর্মকর্তা ব্রেট ম্যাকগার্ক পদত্যাগ করেন। মার্কিন সিদ্ধান্তে আতঙ্কিত কুর্দি বিদ্রোহীরা তুরস্কের অভিযান ঠেকাতে রাশিয়া ও দামেস্কের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তারা মানবিজে সেনা পাঠাতে সিরিয়া সরকারকে অনুরোধ জানায়। দামেস্ক এই সুযোগে সেখানে সেনা পাঠিয়েছে। সিরীয় সেনারা মানবিজে পৌঁছে সেখানে পতাকা উত্তোলন করেছে। কুর্দিদের আশঙ্কা তুরস্ক অভিযান চালালে আফরিন অঞ্চলের মতো মানবিজ থেকেও কুর্দি বাসিন্দা ও ওয়াইপিজি বিদ্রোহীদের সেখান থেকে বিতাড়িত হতে হবে। চলতি বছরের প্রথম দিকে তুরস্ক আফরিনে অভিযান চালায়।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত তুরস্কের জন্য এক দিকে সুযোগ অন্য দিকে বিপদও। তুরস্ক অভিযোগ করছিল, সন্ত্রাসী ওয়াইপিজিকে যুক্তরাষ্ট্র আইএসবিরোধী লড়াইয়ে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। মার্কিন প্রত্যাহারের ফলে তুরস্ক অবাধে ওয়াইপিজিকে সীমান্তের ৫০০ কিলোমিটার দূরত্বে হটিয়ে দিতে সক্ষম হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares