জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পৃথিবী আবার প্রাণিশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২৫ কোটি ২০ লাখ বছর আগে ভূমিতে বসবাসকারী ৭০ শতাংশ এবং পানিতে বসবাসকারী ৯৬ শতাংশ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। গবেষকেরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বর্তমানে ঠিক একই রকম প্রক্রিয়া বিরাজ করছে। যদি জলবায়ু পরিবর্তনকে এভাবেই চলতে দেয়া হয় তাহলে পৃথিবীর প্রাণী জগতে আবারো এ ধরনের বিলুপ্তির ঘটনা ঘটবে। বিশাল বিশাল আগ্নেয়গিরির দীর্ঘ সময় ধরে এবং থেমে থেমে অগ্ন্যুৎপাতের কারণে তখন পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে যায় এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে প্রাণী জগতের বিলুপ্তির ঘটনা ঘটে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বলেন, সেটা ছিল পারমিয়ান যুগের সময়। তখন পাঙ্গিয়া নামক একটি সুপারকন্টিনেন্টে পৃথিবী একসাথে জোড়া লাগানো ছিল। ‘দ্য গ্রেট ডাইয়িং’ নামে একটা বিশাল ধরনের এবং বিপরীত ধর্মী বিবর্তন সব কিছুকে ধ্বংস করে দেয় ২৫ কোটি ২০ লাখ বছর আগে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশেনোগ্রাফি বিশেষজ্ঞ কার্টিস ডয়েচ বলেন, এটা ছিল একটা বিশাল ঘটনা। গত ৫০ কোটি বছরে পৃথিবীর প্রাণী জগতে বিলুপ্তির এটা ছিল সবচেয়ে খারাপ ঘটনা।
একটা বিশাল ঘটনা ঘটার পরও গত প্রায় ২০ বছর থেকে গবেষকেরা এ সম্বন্ধে কিছু কিছু তথ্য পাচ্ছিলেন। মহাসাগর বিশেষজ্ঞ ড. কার্টিস ডয়েচ আরো বলেন, ভূগোলের সংজ্ঞা অনুযায়ী ২৫ কোটি ২০ লাখ বছর একটি দীর্ঘ সময়। বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বের করা সহজ কোনো কাজ নয়। তবু আধুনিক ‘সময় প্রযুক্তির’ (জিরকন ক্রিস্টাল) মাধ্যমে কয়েক হাজার বছরের বিলুপ্তির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।
একই রকমের রেডিওমেট্রিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রাণী জগৎ বিলুপ্তির ওই ঘটনা ঘটেছিল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে। তবু এটা এখানো সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না যে কিভাবে অগ্ন্যুৎপাতের সাথে বিলুপ্তির সম্পর্ক ঘটে। কিন্তু এখনকার নতুন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে বিলুপ্তির ওই ঘটনা ঘটেছিল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। থেমে থেমে ওই বিশালকার অগ্নু্যুৎপাত বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। উষ্ণতার কারণে মহাসাগরের অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়েছিল এবং প্রাণী জগৎ দম বন্ধ হয়ে মারা যায়। গবেষকেরা সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমে গরম পানি ও কম অক্সিজেনের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে ‘গ্রেট ডাইয়িংয়ের’ প্রমাণ পেয়েছেন। কার্টিস ডয়েচ বলেন, উষ্ণতা ও অক্সিজেনের মধ্যে সম্পর্ক যদি ঠিক হয় তাহলে পৃথিবীতে এমন পরিবেশ এখনো বিরাজ করছে।
কার্টিস ডয়েচের সহকর্মী ও এ গবেষণার কো-অথর জাস্টিন পেন বলেন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পরিবেশে কার্ব ডাই অক্সাইডের নির্গমন বেড়ে যায়। ফলে দ্রুত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং জীববৈচিত্র্যে এর প্রভাব পড়ে।
এ গবেষণার প্রধান গবেষক ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডির ছাত্র জাস্টিন পেন সিয়াটল টাইমসকে বলেন, তুলনামূলক খুব কম সময়ের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা ঘটে (যেমনটা এখনো চলছে)। ২৫ কোটি ২০ লাখ বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে মানুষের সৃষ্ট গ্রিন হাউজ গ্যাসের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ আজকে যা করছে শেষ পর্যন্ত গণহারে বিলুপ্তিতেই এর পরিবর্তন ঘটবে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে চলতে দিলে আমাদের রাস্তার শেষ কোথায় গবেষণাটি সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটা অব্যাহতভাবে চলতে দিলে আরো অনেক কিছুই আমরা হারাব। যে প্রজাতি হারিয়ে যাবে এগুলোকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। বিজ্ঞানীরা মহাসাগরে অক্সিজেন হ্রাস পাওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন যা পারমিয়ান যুগের সাথে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ।
কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই অবশ্য বিলুপ্তি শুরু হয়েছে যখন থেকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মহাসাগর ৮০ শতাংশ অক্সিজেন হারায়। মহাসাগরের অনেক তলদেশ অক্সিজেন মুক্ত হয়ে যায় তখন। বাস্তবতা হলোÑ গত কয়েক দশকে পৃথিবীর কীটপতঙ্গের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। জিওলজিক্যাল সময় অনুসারে এই কয়েক দশক সময়টা চোখের পলক ফেলার সময়ের মতো। যদি আমাদের গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না আনা যায় তাহলে মানুষসহ পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী জগতের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares