কক্সবাজারে ‘ফণী’ আতঙ্কে স্থানীয়দের সাথে ১১ লাখ রোহিঙ্গা

সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘ফণী’ মোকাবিলায় কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ উপকূলে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামেগঞ্জে মাইকিং করে দুই দিন ধরে প্রচার প্রচারণা চালানো হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে পূর্ব প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণের জন্য বলা হচ্ছে। এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কক্সবাজার সমুদ্রতীরবর্তী এলাকাসমূহে ৪ নং সংকেত বহাল রাখা হয়।

ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ আতঙ্কে রয়েছে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গা ১১ লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে তেমন কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে।

তাজনিমারখোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেড মাঝি মুহাম্মদ আলী জানান, ‘একটি বৃষ্টি আর বাতাস হলে ত্রিপল দিয়ে তৈরী ঝুপড়ি ঘরগুলো লন্ডভন্ড হয়ে যায়। সেখানে এত বড় ঘূর্ণিঝড়ে কি অবস্থা হয় একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ জানে না।’

একই কথা বিভিন্ন ক্যাম্পে রোহিঙ্গা নেতা, মাঝি ও হেডমাঝিসহ সাধারণ রোহিঙ্গা নাগরিকদের। গতবছর মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের এর আগে শরণার্থী জীবনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া ক্যাম্প এলাকায় রোহিঙ্গাদের জন্য দুর্যোগকালীন সময়ের জন্য বিশেষ কোনো আশ্রয়কেন্দ্রও নির্মিত হয়নি এ পর্যন্ত। তাই ফণী আঘাত হানলে ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পরিণতি কি হবে এনিয়ে চরম উদ্বিগ্ন রোহিঙ্গারা।

টেকনাফের হোয়াইক্যং চাকমারকুল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বয়োঃবৃদ্ধ রোহিঙ্গা আজগর আলী বলেন, বাংলাদেশে আসার পর থেকে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করতে হয়নি। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত আনতে পারে এমন সম্ভাবনার খবর ক্যাম্পে প্রচার করা হচ্ছে। তবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বড় ধরনের কোনো দুর্যোগের আশঙ্কা না দেখলে আপাতত ক্যাম্পের ঝুঁপড়ি ঘরে থাকার চিন্তা করছি।

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যুবক আব্দুল হামিদ বলেন, ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের ঝুঁপড়ি ঘরের মাঝে মাঝে বড় বড় পাহাড়ী গাছ রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বা বড় কোনো দুর্যোগে এ গাছগুলো রোহিঙ্গাদের ঝুঁপড়ি ঘরে উপড়ে পড়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া নিরাপদ স্থানে আশ্রয় না নিলে দুর্যোগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রাণহানির সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো সাইক্লোন সেল্টার নেই, তাই রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয়ার মতো নিকটবর্তী নিরাপদ কোনো স্থান নেই। তাছাড়া দুর্যোগের সুযোগে ক্যাম্পের অপরাধীরা নানা ধরণের অপরাধমূলক কর্মকা- ঘটাতে পারে।

এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রবিউল হাসান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফনীর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে টেকনাফ উপকূলে দুই দিন ধরে মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে এবং তাদের উপযুক্ত সময়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘ফণী’ মোকাবেলায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। দুর্যোগ পূর্ববর্তী সময়ে রোহিঙ্গাদেরকে ক্যাম্পের ভেতরে অবস্থিত মসজিদ, স্কুল ও আশপাশের স্থানীয় সাইক্লোন সেল্টারগুলোতে অবস্থান নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া দুর্যোগে অবহেলা না করে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়ার জন্য মাইকিংসহ নানাভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি ইতিমধ্যে প্রস্তুতি সভা, অ্যাম্বুলেন্স, খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রী মজুদ রাখা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি যেন না হয় সে ব্যাপারে প্রশাসনের পাশাপাশি ক্যাম্পে কর্মরত বেশ কিছু এনজিও সংস্থাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও উপকূলীয় এলাকায় ঝুকিপূর্ণ দুটি সাইক্লোন সেন্টার ছাড়া বাকি সাইক্লোন সেন্টার, প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা রাখা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় কর্মরত সেচ্ছাসেবী সংগঠন সিপিপি’র পক্ষ থেকে উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো রয়েছে তা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ঠাঁই দিতে যথেষ্ট নয়। তাছাড়া তার উপর রোহিঙ্গারাও সেখানে ভিড় করলে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকার বাসিন্দা আজম উল্লাহ বলেন, আমাদের পাশর্^বর্তী ঘূর্ণিঝড়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য স্থানীয়দের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি সাইক্লোন সেল্টার রয়েছে। তবে সেখানে স্থানীয়দের সাথে রোহিঙ্গাদের ঠাঁই দেয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।

এদিকে উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফণী থেকে রেহাই পেতে মসজিদে মসজিদে বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা মনে করছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানলে নিশ্চিতভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বড় ধরনের বিপর্যয় হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares