ইন্দোনেশিয়ার নির্বাচনে ইসলাম ও গণতন্ত্রের জয়

বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় গত মাসে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এই গণতান্ত্রিক দেশটির সাধারণ নির্বাচনে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ নি¤œকক্ষসহ প্রাদেশকি পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের বেছে নিতে ১৯ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার এই নির্বাচনী আয়োজন হলো সর্ববৃহৎ। বহু দ্বীপের দেশ ইন্দোনেশিয়ায় নির্বাচনে প্রার্থীই হয়েছিলেন দুই লাখ ৪৫ হাজার।

প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের দুটি পদসহ ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের ১৩৬টি আসন এবং নি¤œকক্ষের ৫৭৫টি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। একই সাথে দুই হাজার ২০৭ জন প্রাদেশিক সদস্য এবং ১৭ হাজার ৬১০ জন স্থানীয় কাউন্সিলর পদের জন্যও ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ১৬টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ১৭ হাজার দ্বীপে ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের সুরক্ষা দিতে প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার পুলিশ ও সেনা সদস্যসহ নিরাপত্তা বাহিনীর ১৬ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়। সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিদেশে থাকা ইন্দোনেশীয় মিশনেও হাজার হাজার ভোটারের আগাম ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। এত বিপুল ভোটার ও সর্ববৃহৎ নির্বাচনী আয়োজন সত্ত্বেও দেশটির নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আরো একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়- দেশটিতে এবারই প্রথম জাল ভোট এড়াতে হালাল কালিতে ভোটাররা তাদের আঙুল চুবিয়ে ভোট দিয়েছেন।

২৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো জয়লাভ করেছেন। তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় বহাল থাকছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপেও তিনি এগিয়েছিলেন। বেশির ভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষকও নির্বাচনে উইদোদোর জয়ের আভাস দিয়েছিলেন। তার প্রথম মেয়াদে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হর ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালে সাবেক জেনারেল প্রবো সুবিয়ান্তোকে সামান্য ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন উইদোদো। একটি ছোট শহরের মেয়র হিসেবে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করা উইদোদো আগে ছিলেন সাধারণ একজন ব্যবসায়ী।

১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়ার জনগণ সাবেক স্বৈরশাসক সুহার্তোকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। এরপর দেশটিতে সত্যিকারের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু হয়। জোকো উইদোদোর প্রতিদ্বন্দ্বী ৬৭ বছর বয়সী সুবিয়ান্তো সুহার্তোর জামাতা। তিনি রাজনৈতিক অভিজাত পরিবারের সন্তান। তার বাবা ছিলেন একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার জনগণ আবারো তুলনামূলকভাবে একজন সাধারণ রাজনীতিককেই দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

ইন্দোনেশিয়ায় এবারের নির্বাচনে একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে দেখা গেছে- যারা ইসলামের পক্ষে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, জনগণ তাদেরকেই বিজয়ী করেছেন। ইসলামবিরোধী প্রচারণা সেখানে তেমন কোনো পাত্তা পায়নি। ভোটারদের বড় অংশই তরুণ এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামের সমর্থক। তারা নিজেদেরকে সত্যিকারের একজন মুসলিম ও ইসলামপন্থী বলে পরিচয় দিতে গৌরব বোধ করেন।

জেনারেল সুবিয়ান্তোও নিজেকে ইসলামপন্থী হিসেবে দেখানোর জন্য কট্টর ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে জোট গঠনের মাধ্যমে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চেয়েছিলেন। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক একাকুরনিওয়ান একটি পত্রিকায় লিখেছিলেন ইসলামপন্থীরা ইতোমধ্যে জয়লাভ করেছেন।

ইন্দোনেশিয়ায় দেশ শাসন করতে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ধর্মের অনুসরণকে গুরুত্ব দিতে হবে প্রেসিডেন্ট উইদোদোকে। বিরোধী কট্টর ইসলামপন্থীদের মোকাবেলা করেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমাদ সুকারসোনো বলেছেন, খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই উইদোদোকে মুসিলম সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামত ও স্বার্থকে সমন্বয় করতে হবে। অবশ্য ইন্দোনেশিয়ার ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম হলেও দেশটি সরকারিভাবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। দেশটিতে খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুরও বসবাস রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় মোটামুটি ধর্মীয় সহনশীলতা বজায় রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের দেশ হিসেবে দেশটিতে শরিয়াভিত্তিক অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা রয়েছে।

অবশ্য বিরোধী প্রার্থী সুবিয়ান্তো নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে প্রাথমিক ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তিনি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সোলো (সুরাকারিতা) শহরের বস্তিতে এক সময় বেড়ে ওঠা উইদোদো ২০০৪ সালে ওই শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়ে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করার পর ক্রমেই এগিয়ে গেছেন। ২০১২ সালে তিনি রাজধানী জাকার্তার গভর্নর নির্বাচিত হন। ছিলেন সামান্য একজন ফার্নিচার বিক্রেতা। গত পাঁচ বছরে গরিবদের জন্য অনেক কিছু করেছেন তিনি। তাদের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, গ্রামের উন্নয়ন, হাসপাতাল ও রেলপথ নির্মাণ করেছে তার সরকার। সুহার্তোর পতনের পর থেকে প্রবোদো নির্বাচনে লড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু জনগণ এবার নিয়ে চতুর্থবারের মতো স্বৈরশাসকের জামাতাকে প্রত্যাখ্যান করে গরিবের বন্ধু উইদোদোর গলায় আবার বিজয়মাল্য পরিয়ে দিয়েছেন। উইদোদো সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশ শাসন করবেন, এটাই ইন্দোনেশিয়ার জনগণের প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares