শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং অশান্ত কাশ্মির

জাতীয় ভোটার দিবসের আগের দিন গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে হয়ে গেল অনেকটা ভোটারবিহীন মেয়র নির্বাচন। বৈরী আবহাওয়ার মাঝে, সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতাপুষ্ট ভোটারা অনাগ্রহবোধ করায় এবং মেয়র পদে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায়, এ নির্বাচন আকর্ষণ হারিয়েছিল আগেই। নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি নিলেও এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনটি দৃশ্যত ‘সাজানো আনুষ্ঠানিকতা’য় পর্যবসিত হয়। বৃষ্টিবাদলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন ও ‘নিয়ন্ত্রিত’ নির্বাচন অত্যন্ত স্বল্পসংখ্যক মানুষকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল।

ফলে গোলযোগের সম্ভাবনাহীনতা নিশ্চিত করেছিল ‘অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন’। আলোচিত মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুজনিত কারণে, ঢাকা উত্তর সিটির এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আতিকুল ইসলাম ছাড়াও জাতীয় পার্টির প্রার্থী, প্রখ্যাত ব্যান্ডশিল্পী শাফিন আহমেদসহ কয়েকজন প্রার্থী ছিলেন মেয়র পদে। এ দিক দিয়ে তাত্ত্বিকভাবে নির্বাচনটিকে ‘অংশগ্রহণমূলক’ হয়তো বলা চলে। তবে দেশের মূল বিরোধী দল এবং তাদের জোট আগেই এ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ায় এটা কার্যত জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণীয় হতে পারেনি। এদিক দিয়ে এই নির্বাচন আর বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দেশবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন।

আমার বাসার কাছেই ভোটকেন্দ্র। কাগজকলমে অনেক ভোটার। গত সংসদ নির্বাচনের দিনও এখানে শত শত মানুষের ভিড় আর লাইন দেখা গেছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র নির্বাচনের দিন সকাল ৮টার পরে ও অনেকক্ষণ কোনো ভোটার দেখা গেল না। এরপর অফিসে চলে আসি। মেয়র নির্বাচনের তেমন তোড়জোড় আর হাঁকডাক না থাকার সুযোগে কয়েকটি বাস-মিনিবাস সকাল থেকে রাস্তায় চলতে পেরেছে। ফলে যাত্রীদের সুবিধা হয়েছে। এ অবস্থায়, রাইড শেয়ারে মোটরবাইক যারা চালান, তারা বেশি আয় করতে পারেননি। তেমন চাহিদা বাড়েনি রিকশারও। এবার মেয়র নির্বাচনের দিন ভোট দেয়ার গরজ বোধ না করে কিংবা ভোটের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে অনেকেই সকাল থেকে যথারীতি দোকানপাট চালু রেখেছিলেন।

রাজধানীর দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে অফিসে যাওয়া-আসার পথে কোথাও নির্বাচনী আমেজ দেখিনি। দু-এক জায়গায় ঝোলানো কিছু পোস্টার এবং ভোটারলিস্ট নিয়ে দু-চারজনকে বসে থাকতে দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক, এসব ‘সাজানো’ ব্যাপার, নিছক লোক দেখানো। আর ‘পাতানো’ নির্বাচনের সন্দেহ ও অভিযোগ তো আছেই। দুপুরে বাসায় ফেরার পথেও কোথাও নির্বাচনী ব্যস্ততা নজরে আসেনি। একজন নাগরিকের মন্তব্য ছিল, ‘সাবালক ভোটাররা ভোট না দিলে নাবালকদের (শিশুকিশোর) প্রক্সি দেয়ার সুবিধা হয়।’ এই ‘প্রক্সি’র মানে কী, তা বলার প্রয়োজন নেই।

এ পরিস্থিতি জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচনকে বাহ্যিকভাবে প্রহসন বানালেও মূলত গণতন্ত্রের জন্য ট্র্যাজেডি। শোকাবহ, দুঃখজনক, মর্মান্তিক অথবা বেদনাদায়ক ঘটনা ট্র্যাজেডিরূপে গণ্য। আমাদের দেশে ইলেকশনের ‘ডক্টর’ আর ‘ইঞ্জিনিয়ার’রা নির্বাচন থেকে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়ে যে প্রহসন মঞ্চস্থ করে আসছেন, তা দেখে সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকেরা হাসেন। তবে এ হাসি আনন্দের নয়, আফসোসের। হাসি অনেক ক্ষেত্রে বেদনার ব্যঙ্গাত্মক বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। হয়তো এ জন্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখে গেছেন, ‘আমারে পাছে বুঝিতে পারো, তাইতো এতো লীলার ছল;/ বাহিরে যার হাসির ছটা, ভেতরে তার চোখের জল।’ এই অশ্রু যে কারণে, তা হলো বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ট্র্যাজিক পরিণতি। এ ক্ষতি অপূরণীয় এবং এটা কারো জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।

আগেই ধারণা করা গেছে, ভোটার ভোটকেন্দ্রে যান বা না যান, নির্বাচনের ফলাফলে দেখানো হবে অমুক এত হাজার বা এত লাখ ভোট পেয়েছেন। তা না হলে হয়তো নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, সরকার- কারো মানসম্মান অক্ষুণœ থাকে না। যেভাবেই হোক, বাক্সে ‘সম্মানজনক’ সংখ্যক ব্যালট থাকা চাই। সেটা আগের রাতে হোক আর পরের দিনে হোক। ‘আমার ভোট আমি দেবো’ কার্যত বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না বাধাবিপত্তির কারণে। এখন তার কারণ মূলত হতাশাজনিত অনীহা ও অনাগ্রহ। দুটোই গণতন্ত্রের চেতনার পরিপন্থী। এ অবস্থায় তারাই অবাধে তৎপর থাকে যাদের মনের কথা হলো, ‘আপনার ভোটও আমি দেবো।’ এবার ভোট কেউ দেননি, ‘ভোট দিয়ে কী লাভ’ গোছের হতাশা থেকে। কেউ কেউ ভোট দিতে যাননি সংসদ নির্বাচনে প্রহসন (প্রতারণা+কারচুপি+সন্ত্রাস) দেখে; আর কেউবা আগেই নিশ্চিত ছিলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলই জিতবে প্রায় ফাঁকা মাঠে।’ বড় কথা হলো, বিএনপি না থাকায় ভোট জমেনি, ভোটার আসেনি।

মেয়র নির্বাচনের পর মহাজ্ঞানী মহাজনদের অমিয় বচন শোনা গেছে। একজন শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী নেতা ও জাঁদরেল মন্ত্রীর ভাষায়, ‘এবার ঢাকায় মেয়র নির্বাচনে বড় কোনো দল অংশ না নেয়ায় ভোটারের উপস্থিতি ছিল কম।’ প্রশ্ন হলো, তা হলে কি ক্ষমতাসীন দলটিও একটি ছোট সংগঠন? সে দলটিকে এই নেতারাই বলেছেন, ‘দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল।’ তাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থকের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র ভোট দিয়েছেন বলেই কি মন্ত্রীপ্রবর স্বীকৃতি দিলেন? আরেক নেতা উল্টাপাল্টা ও আবোলতাবোল কথার জন্য আলোচিত। তার আবিষ্কার হলো, বিরোধী দলের জনসমর্থন নেই, তাই তারা মেয়র ইলেকশনে নেই।’ বিরোধী দলের একজন প্রবীণ নেতা বলেছেন, জনগণ বিগত জাতীয় নির্বাচনের মতো এবার স্থানীয় নির্বাচনও প্রত্যাখ্যান করেছে। ‘মোক্ষম’ উক্তি শুনিয়েছেন বিতর্কিত সিইসি। তার সাফ কথা, ‘পরাজিতরা বলে থাকেন- নির্বাচন ভালো হয়নি। তবে নির্বাচন কমিশন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ এ কথা শুনে কে হাসবেন আর কে কাঁদবেন নাকি রেগে যাবেন, তা পাঠকদের নিজস্ব ব্যাপার। এটা অনস্বীকার্য, এবার সংসদ নির্বাচনকালে জাতি দেখেছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন কেমন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পারে।

মেয়র নির্বাচনের পর দিনের পত্রিকা দেখলেই বোঝা যায়, নির্বাচনটা কিরূপ ছিল। একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকার প্রধান ছবির ক্যাপশন ছিল, ‘মেয়র পদে উপনির্বাচনে এই ভোটকেন্দ্র সারা দিনই ছিল প্রায় ফাঁকা। অলস দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা কর্মীরা।’ ছবিটি উত্তরার একটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। নিচে লিড নিউজের শুরুতে বলা হয়, ‘আগে থেকেই নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ ছিল না। ভোটের দিনও দেখা গেল না ভোটারদের তেমন উপস্থিতি।’ পাশেই সংবাদ শিরোনাম : ‘ভোটারের অপেক্ষায় ছিল ভোটকেন্দ্র’। এদিকে, সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা হারানোর প্রকাশ ঘটেছে এ নির্বাচনে।’ সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি দৈনিক পত্রিকা প্রথম পৃষ্ঠায় ভোটারবিহীন একটি কেন্দ্রের ছবি দিয়ে হেডিং দিয়েছে, ‘নজিরবিহীন অনুপস্থিতি মেয়র ভোটে।’ যখন এটাই বাস্তবতা, তখন সিইসি ভোটারদের কম উপস্থিতির দায় ছাপালেন রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। এটা শুনে মনে হতে পারে, নির্বাচন কমিশনের কোনো দায় নেই; ব্যর্থতা নেই। ক্ষমতাসীন দলের দু’নম্বর নেতার মতে, ‘শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে।’ এটা পড়ে একজন ঢাকাবাসী বললেন, যে ক’জন ভোট দিতে গেছেন, তারা না গেলে আরো ‘শান্তিপূর্ণ’ হতো মেয়র নির্বাচন।

কোনো কোনো সংবাদপত্রের ‘চালাকি’ (যা আসলে বাস্তবতা আড়াল করার ব্যর্থ প্রয়াস) মানুষের চোখ এড়িয়ে যায়নি। যেমন, সরকারের পছন্দনীয় একটি দৈনিক সংবাদপত্র হেডিং করেছে, ‘বড় ব্যবধানে জয় পেলেন আতিকুল’। প্রধান বিরোধী দল বা জোট অংশ নিলে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবং মানুষ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেলে যদি এমন ফল হতো, তাহলে বলা যেত, ‘সত্যিই, বিজয়ী দল খুব জনপ্রিয়।’ পত্রিকাটি হাতেগোনা ভোটারের স্বল্পতা ধামাচাপা দিতে বলেছে, ভোটার উপস্থিতি ‘প্রত্যাশার চেয়ে কম’। তবে যে যা লিখুক বা বলুক, ঢাকার ইতিহাসে কেবল নয়, এ দেশের ইতিহাসেও এমন জনশূন্য মেয়র নির্বাচন আর হয়নি।

এহেন পরিস্থিতিতে শুক্রবার ছিল ‘জাতীয় ভোটার দিবস।’ সরকারি উদ্যোগে শোভাযাত্রা বের হয়েছে, আলোচনা সভারও আয়োজন ছিল। প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘আমি ভোটার হবো’, ‘১৮ বছর বয়স হলে ভোটার হোন’। কথা হলো, যদি ভোটই দেয়ার পরিবেশ না থাকে এবং ভোট দিতে বাধা আসে, তা হলে ভোটার হওয়ার আগ্রহ থাকবে কি? এ জন্যই একজন প্রবীণ রাজনীতিক বলেন, ‘মানুষ যেখানে তার ভোট দিতে পারে না, সেখানে ভোটার দিবস পালন করা হাস্যকর।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares