‘মুদ্রা চুরিতে শিরশ্ছেদ, রাষ্ট্র চুরিতে রাষ্ট্রাভিষেক’

পুরাতন এই চীনা প্রবাদ বাক্যটি অনেক দেশের রাজনৈতিক দলীয় শাসন পর্যালোচনায় বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়। সীমিত রাজনৈতিক দল আর কেতাদুরস্ত গণতন্ত্র চর্চায় সরকারের পালাবদল ও আইনের শাসন যেন উন্নত বিশ্বের নৈতিকতা পোষণীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

পক্ষান্তরে, উন্নয়নশীল বিশ্বে এর গুণে, মানে ও প্রয়োগের ক্ষেত্রবিশেষে স্বজনপ্রীতি, প্রিয়পোষণ ও দুর্নীতি এই ত্রিশূল বিদ্ধতায় গণতন্ত্রে আইনের শ্রেষ্ঠত্বের চেয়ে আইন ‘প্রয়োগকারীর শ্রেষ্ঠত্ব’ হয়ে যায় স্বীকৃত। মানবজাতিতত্ত্বের বৈসাদৃশ্য তাদের ওই গণতন্ত্র অনুশীলনে অক্ষমতা কোনো কারণ হতে পারে না। তবে পুঁজিবাদ স্বীকৃত বলে গণতন্ত্র দরিদ্রতায় বেমানানের জন্য অনুকরণে অনীহা বলা যায়। কারণ এমন অবস্থায় বিশেষত সুযোগ ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর যেমনি চাওয়ার শেষ থাকে না, তেমনি পাওয়ায়ও কারো মন ভরে না।

অবৈধ সম্পদ ধর্মে পাপ; রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সমাজতন্ত্রে চুরি আর গণতন্ত্রে ক্ষমতার অপব্যবহারে চরম বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ আত্মতুষ্টির রাষ্ট্রীয় চুরি। ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবারি চার্চের সর্বপ্রধান খ্রিষ্টীয় যাজক সেন্ট অগাস্টিনের (৬০১-০৪ খ্রি:) বিখ্যাত উক্তির পুনরুল্লেখে বলা যায়, ‘Highway robbery on a large scale’ অর্থাৎ, রাজপথে বৃহদাকারে চুরি। উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এর স্বাভাবিকতায় অনেকেই শ্রম, আর কেউ যেনবা পুঁজির বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়ে নিজেকে নিয়োজিত করেন রাজনৈতিক পেশায়। এমনটাই হয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ এবং যে যত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা পৃষ্ঠপোষকতা ভোগী, সেই পান গণতন্ত্রী ভাগ্যের ‘আলাদিনের চেরাগ।’

ইংরেজ কবি ও চিন্তাবিদ শেলীর (১৭৯২-১৮২২ খ্রি:) ‘The richer have become richer, and the poor have become poorer, and the vessel of the state is driven between the scylla and carbides of anarchy and despotism.’ (ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে এবং গরিবেরা আরো গরিব হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বাহন নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতার উভয় সঙ্কটের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে) এই মন্তব্যটি সেকালের রাজতন্ত্রী যুগের হলেও, আজ প্রায় ২০০ বছর পরেও প্রজাতন্ত্রী গণতন্ত্রের লেবাসধারী অনেক দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিচ্ছবি।

উন্নত বিশ্বে অবৈধ অর্থপাচার বা সুইস ব্যাংকে গোপনে জমার নজির পাওয়া ভার; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে অনেক বর্ণচোর ধনী ও রাজনীতির ব্যবসায়ীরা স্বদেশে কপট সমাজহিতৈষী ও দেশদরদিরা এমনটাই করে থাকেন। এ জন্য রাজতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রে শিরশ্ছেদ বা শাস্তির ভয় থাকলেও গণতন্ত্রে রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা ছাড়াও এর আইনে, বিশেষত ইংরেজ দার্শনিক জোনাথন সুইপ্টের কথায়, ‘খধংি বিৎব ষরশব পড়নবিনং, যিবৎব ঃযব ংসধষষ ভষরবং বিৎব পধঁমযঃ, ধহফ ঃযব মৎবধঃ নৎবধশ ঃযৎড়ঁময,’ অর্থাৎ, আইন যেন মাকড়সার জালের মতো, যাতে ছোট মাছি ধরা পড়ে আর বড়রা ছিঁড়ে বের হয়ে যায়।

২০১১ সালের ২০ আগস্ট দৈনিক নয়া দিগন্তে ‘সুইস ব্যাংকে কালো টাকার প্রধান উৎস ভারত’ শিরোনামে প্রকাশিত বিস্ময়কর এক সংবাদে বলা হয়েছে ‘অর্থ সঞ্চয়কারী দুই হাজারের নাম পেয়েছে। এদের বেশির ভাগই ভারতীয়। ১৯৭০-এর দশকে স্টক মার্কেটের অবৈধ শেয়ার, মাদক পাচার, ভুয়া প্রকল্পের অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা করার প্রবতা শুরু হয়। উইকিলিকসে প্রকাশিত ভারতীয় অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের ২৯ জনের নামসহ তাদের প্রায় ১৫,৬৮,২৬৫ কোটি ভারতীয় রুপি জমাকারীর প্রায়জনই কোটি কোটি বুভুক্ষু ভারতীয়ের কাছে পূজনীয় দেশদরদি খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ।

বিগত ১৯-০২-২০১৮ নয়া দিগন্তে ‘বিআইডিএসে গবেষণা সেমিনারে সুবিধাপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় ভারতীয়রা রাজনীতিতে’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ‘আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্তি কিংবা সামাজিক ভাবমূর্তি নির্মাণের আকাক্সক্ষা থেকেই ভারতীয়রা রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। এক কথায়, কোনো কিছু পাওয়ার আশা নিয়েই তারা রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে এমনটা প্রায় সর্বত্র।

বিগত ২৯-৪-২০০৭ দৈনিক ইত্তেফাকে, ‘পাচার করা অর্থ ফেরত আনা হচ্ছে। ফিরিয়ে আনা হয়েছে ২৭০ কোটি টাকা। বিদেশের পাঁচ ব্যাংকে ১৬ অ্যাকাউন্টের সন্ধান’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ২১-০৬-২০১৪ দৈনিক যুগান্তরে, ‘দুর্নীতির টাকা সুইস ব্যাংকে। জড়িত আমলা, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী। পাচারকারীদের শাস্তি দাবি।’ ২৬-১১-২০১৭ নয়া দিগন্তে ‘রাজনীতিবিদেরা দুর্নীতিমুক্ত থাকলে দুর্নীতি অর্ধেক কমবে- কাদের’ সংবাদটি একটি অপ্রিয় সত্য কথা। তাই রাষ্ট্রচোরদের রাষ্ট্রাভিষেক করা হলে তা প্রকৃত রাজনীতিকদের প্রতি জনগণের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা হারানোর কারণ হতে বাধ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares