ভোটের আগে যেসব কথা ভাবছি

কিছু ভোটার আছেন যারা কোনো ভাবনা-চিন্তা না করেই ভোট দেন। আবার অনেক ভোটার আছেন, যারা যথেষ্ট ভাবনা-চিন্তা করে ভোট দেন। রাষ্ট্র হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশের জন্ম সে দিনের ঘটনামাত্র। বর্তমান জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে একাদশ নির্বাচন। তাই মনে আসছে এটি ঘিরে নানা রকম ভাবনা। কেননা, আমাদের সামান্য ভুলে তৈরি হতে পারে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিলুপ্তির পথ। একদিন যা ছিল পূর্ব পাকিস্তান, তাই আজ নাম পেয়েছে, একটা ভিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে, বাংলাদেশ।

যদি পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত না হতো তবে আজকের বাংলাদেশের উদ্ভব কখনোই সম্ভব হতো না। অনেকে চাচ্ছেন এই সাধারণ ইতিহাসটুকুকে ভুলে যেতে এবং অন্যদেরকেও ভুলিয়ে দিতে। এর পরিণতি হতে পারে মহাবিপর্যয়কর। তাই আজ ভোটের আগে আমার এই লেখা।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভূগোল বদলে যাচ্ছে। পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ বলেছিল, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।’ কিন্তু ফারাক্কা ব্যারাজ করায় পদ্মায় আর আগের মতো পানি আসছে না। চীন তিব্বতে সাংপো নদীর ওপর দিচ্ছে বাঁধ। চাষের জন্য সে গ্রহণ করতে যাচ্ছে সাংপো নদীর পানি। ব্রহ্মপুত্রে তিব্বতের অংশের নাম সাংপো। সাংপো থেকে এভাবে পানি নিলে যমুনায় আর আগের মতো পানি আসবে না।

আমরা জানি একসময় যমুনা নদী দিয়েই আসত বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পানি। ভারত আসামে বরাক নদীর ওপর করছে ব্যারাজ। এই ব্যারাজ করা হলে মেঘনাতেও আর আসবে না আগের মতো পানি। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখনও বলতে পারছে, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।’ কিন্তু এই ঠিকানা আর ক’দিন পরেই হতে যাচ্ছে ‘গরঠিকানা’। আওয়ামী লীগের চিন্তাচেতনা যেন আটকে যেতে চাচ্ছে ১৯৭০ সালেই। এ রকম একটি দল বাংলাদেশকে কতটা নেতৃত্ব দিতে পারে, ভোটের আগে সেটা আবশ্যিক হয়েই পড়েছে বলে মনে হয়; অন্য কোনো কারণে না হলেও ভৌগোলিক জ্ঞানের অপরিচ্ছন্নতার জন্য।

যেকোনো রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণের সে দেশের ইতিহাস ভূগোল অবশ্য বিচার্য। কোনো দল যদি এই দুইয়ের বিবেচনা না করে নীতি করতে যায়, তবে পদে পদেই সে পৌঁছাতে পারে ভুল সিদ্ধান্তে। ১৯৭০ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয়নি। চীন নিতে চায়নি সাংপো নদীর পানি। ভারত গড়তে চায়নি বরাক নদীর ওপর ব্যারাজ। তখন আওয়ামী লীগ তুলেছিল জয়বাংলা ধ্বনি। বলেছিল একমাত্র পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের জন্য পূর্ব পাকিস্তান উন্নতি করতে পারছে না।

কিন্তু আমরা এখন এসে পড়েছি সম্পূর্ণ এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে। আমরা কি এখন পানির অভাবে বাঁচব? বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মওসুমি বায়ুর প্রভাবে বর্ষাকালে যথেষ্ট বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টির পানি ধরে রেখে পানির সমস্যা সমাধানের চিন্তা করতে হবে। কিন্তু এটা কোনো রাজনৈতিক সমস্যা নয়। সমস্যা ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার। রাজনীতিকরা কেবল করতে পারেন একে সাহায্য-সহযোগিতা মাত্র। আওয়ামী লীগ করতে চাচ্ছে পদ্মা নদীর ওপর দ্বিতীয় পদ্মা সেতু। ফারাক্কা ব্যারাজের ফলে পদ্মার পানিপ্রবাহ এমনিতেই মন্থর হয়ে পড়েছে। এই সেতু নির্মাণের ফলে তাতে আরো সহজে পড়তে চাইবে চর।

ফলে পদ্মা হয়ে উঠবে একটা মরা নদী। আর পদ্মার খাদ হয়তো হয়ে উঠবে ভিন্ন। সব মিলিয়ে অবস্থাটা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনুকূল হবে বলে আমার মনে হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সেটার একটা অর্থ দাঁড়াতে পারে ভুল নীতির ধারাবাহিকতা বহন।

গণতন্ত্রে ভোটের মাধ্যমে দল বদলায়। একটি দলের বদলে আরেকটি দলকে ক্ষমতায় আনে। কেননা, একটি দল বেশি দিন ক্ষতায় থাকলে তা হয়ে উঠে দুর্নীতিপরায়ণ। হতে থাকে দলটির পক্ষ থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার। ক্ষমতা মানুষকে জেদি, পীড়ক, স্বার্থপর করে তুলতে চায়। যদিও আবার এ কথা সত্য যে, ক্ষমতা ছাড়া মানুষ কোনো কিছুই করতে পারে না। ক্ষমতার অপব্যবহার যাতে কম হয় সে জন্যই মানুষ ভাবতে পেরেছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা। গণতন্ত্র রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে। এটাই গণতন্ত্রীদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রধান যুক্তি।

আওয়ামী লীগ বলেছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। কিন্তু সে নিজেই যে হয়ে উঠতে চাচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিবন্ধক। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ শাসনামলে হতে পেরেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। যা নানা কারণে এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের দশ ভাগের একভাগ জমি কার্যত থাকবে না বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। এই চুক্তিতে প্রকারান্তরে চাকমাদের মেনে নেয়া হয়েছে একটা ভিন্ন জাতি।

অথচ শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটি গিয়ে বলেছিলেন, দেশের সব অধিবাসী বাঙালি হিসেবে বিবেচিত হবে। শেখ হাসিনা তার পিতার কথা নানাভাবেই স্মরণ করেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যেন তার পিতার নীতিকে তিনি করেছেন অস্বীকার। খালেদা জিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির তীব্র নিন্দা করেছিলেন। বলেছিলেন এটা হয়ে উঠবে বাংলাদেশী জাতিসত্তা গঠনের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিবন্ধক। ২০০১ সালের ৩১ মার্চ গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।

এখন এই ফোরাম থেকে দাবি করা হচ্ছে বাংলাদেশের সব উপজাতিকে বাংলাদেশের সংবিধানে স্থান দিতে হবে। দিতে হবে এক একটি ক্ষুদ্র নৃ-জাতিক সত্তা হিসেবে। কিন্তু এটা করতে গেলে বাংলাদেশের যে কী বিরাট ক্ষতি হতে পারে, সে সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উপজাতি হচ্ছে সাঁওতাল। এরা দাবি তুলেছেন সাঁওতালি ভাষাকে দিতে হবে সরকারি স্বীকৃতি। ভারতের ঝাড়খণ্ড প্রদেশে বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণে অধিক সাঁওতাল বাস করে।

কিন্তু সেখানে সাঁওতালি ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। ঝাড়খণ্ডের সরকারি ভাষা করা হয়েছে নাগরি অক্ষরে লিখিত সংস্কৃতবহুল হিন্দি ভাষা। কিন্তু বাংলাদেশে সাঁওতালরা সাঁওতালি ভাষা লিখতে চাচ্ছেন রোমান বর্ণমালায়। যেহেতু সাঁওতালরা বাংলাদেশে বেশির ভাগই গ্রহণ করেছেন কোনো না কোনো রকমের খ্রিষ্টান-ধর্ম। তাই তাদের জাতিসত্তা হয়ে উঠতে চাচ্ছে বাংলাভাষী সাধারণ জনসমষ্টি থেকে আরো ভিন্ন।

আওয়ামী লীগ এবারের ভোটযুদ্ধে বিশেষভাবে বলছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। বলছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের ভোট না দিতে। কিন্তু ১৯৭১-এর পরিস্থিতি ছিল খুবই জটিল। সাবেক পাকিস্তান ছিল আন্তর্জাতিকভাবে একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র। সে ছিল জাতিসঙ্ঘের সদস্য। পূর্ব পাকিস্তান ছিল সাবেক পাকিস্তানের একটি প্রদেশ মাত্র। পূর্ব পাকিস্তানে পাকবাহিনীর উপস্থিতিকে আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে বলা যায় কিনা সে প্রশ্ন আসে হানাদার বাহিনী। কেননা, নিজ দেশের বাহিনী হানাদার বাহিনী বলে বিবেচ্য হতে পারে না।

১৯৭০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের’ অধীনে। আওয়ামী লীগ এই আইন কাঠামোকে পুরোপুরি মেনে নিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল পাকিস্তান হবে একটি ইসলামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এতে ছিল না ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো কথা। এতে বলা হয়েছিল নির্বাচনের ফলে যে গণপরিষদ গঠিত হবে তার কাজ হবে আইনানুগ আইন কাঠামোর মধ্য থেকে সংবিধান প্রণয়ন।

কথা ছিল না এই সংবিধান প্রণেতারাই যতক্ষণ না নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত গঠন করবেন সরকার। কিন্তু প্রশ্ন উঠানো হলো, নির্বাচিত গণপরিষদের হাতে ক্ষমতা প্রদান করার। এর ফলে সৃষ্টি হতে পারল আওয়ামী লীগের সাথে পাকিস্তানের পিপলস প্রগ্রেসিভ পার্টির সঙ্ঘাত। শেখ মুজিবুর রহমান চাননি সাবেক পাকিস্তান ভেঙে দিতে। তিনি দাবি করেছিলেন, যেহেতু তিনি পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা, তাই তাকে করতে হবে সমগ্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

অন্যদিকে জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, যেহেতু তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছেন, তাই তাকে করতে হবে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের প্রধানমন্ত্রী। এক রাষ্ট্রের দু’জন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না। তাই বলতে হয় শেখ মুজিব নন, জুলফিকার আলী ভুট্টোই হলেন সাবেক পাকিস্তান ভাঙার জন্য দায়ী। এসব কারণেই পূর্ব পাকিস্তানের জনমত ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় ঠিক করতে পারেনি কোন পক্ষ গ্রহণ করবে। যারা চায়নি সাবেক পাকিস্তান ভাঙতে, তারা যে তাই কোনো বেআইনি কাজ করেছে এমন কথা বলা যায় না।

কেননা, সাবেক পাকিস্তান ছিল তখন আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে একটি আইনসিদ্ধ রাষ্ট্র। সাবেক পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ আর পূর্ব অংশ দু’টি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান ছিল না এখনকার বাংলাদেশের মতো জাতিসঙ্ঘের সদস্য। তাই পাকিস্তানকে সমর্থন একটি পৃথক রাষ্ট্রকে সমর্থন করা ছিল না। কেবল সাধারণ মানুষ নন, প্রথম শ্রেণীর অফিসারেরাও সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রধানত তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারকেই, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে নয়।

সে সময় বাংলাভাষী সিএসপি অফিসারদের সংখ্যা ছিল ১৮০ জন এবং ইপিসিএস অফিসারদের সংখ্যা ছিল ৯৫০ জন। বাংলাভাষী সিএসপি অফিসারদের মধ্যে মাত্র ১৩ জন মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। ইপিসিএস’দের মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন যোগ দিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারে। সর্বস্তরের মাত্র ৫০০ জন সরকারি কর্মচারী মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন; আর সবাই অনুগত ছিলেন সে সময়ের পাকিস্তান সরকারের প্রতি।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পর ভারত বাংলাদেশ থেকে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যকে ভারতে নিয়ে যায়। তারপর ১৯৭২ সালে ৩ জুলাই ভারতের সিমলায় হয় ভারত-পাকিস্তান চুক্তি। এই চুক্তি অনুসারে পাকিস্তানের ৯৩ হাজার বন্দীকে মুক্তি দেয়া হয়। চলে যেতে দেয়া হয় পাকিস্তানে। সিমলা সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। এমনকি দর্শক হিসেবেও নয়। সম্মেলন শেষে যে যৌথ ইশতেহার বের হয়, তাতে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে উল্লেখ করা হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে; বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে নয়। বাংলাদেশ সরকার এতে কোনো প্রতিবাদ করেনি।

১৯৭১ সালে তদানীন্তন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দু’জন ব্যক্তির পরামর্শ বিশেষভাবেই গ্রহণ করতেন। একজন হলেন দুর্গাপ্রসাদ দার (অনেকে উচ্চারণ করেন ধর), আরেকজন হলেন পিএন হাক্সার। এরা দু’জনেই ছিলেন একসময় কাশ্মিরের অধিবাসী এবং দু’জনই ছিলেন ছাত্রজীবনে মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। দুর্গাপ্রসাদ দারের উদ্যোগে ৯ আগস্ট ১৯৭১-এ হতে পারে ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন মৈত্রী চুক্তি। দুর্গাপ্রসাদ দার ইন্দিরা গান্ধীকে বোঝান যে, এই চুক্তি হওয়ার ফলে ভারত যদি পাকিস্তানকে আক্রমণ করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাতে হস্তক্ষেপে সাহসী হবে না। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ শুরু করে অগ্রসর হতে থাকলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে। পাঠায় সপ্তম নৌবহর। বদলে যায় যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি। নিয়াজি জগজিৎ সিং অররার কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

কিন্তু গোটা পাকিস্তান ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করে না। ভারত একপাক্ষিকভাবে যুদ্ধ থামায় তার পশ্চিম রণাঙ্গনে। ভারত বাংলাদেশ থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়ার পর ১৯৭২-৭৩ সালের মধ্যে বর্তমান পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে চলে আসেন ২৪ হাজার বাংলাভাষী সৈন্য। যাদের মধ্যে ১১০০ ছিলেন অফিসার পর্যায়ের। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রধানত এদের সমর্থনেই সংঘটিত হতে পারে সামরিক ক্যুদেতা।

অনেক চক্র ও চক্রান্ত চলেছিল বাংলাদেশকে নিয়ে। তাজউদ্দীন আহমদ মুজিবনগরের নাম করে কলকাতায় গড়েছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। তাজউদ্দীন আহমদ, উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ছিলেন একজন মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। দুর্গাপ্রসাদ দার ও পিএন হাক্সারের সাথে তাই তার গড়ে উঠতে পারে বিশেষ সখ্য। এদের পরিকল্পনা সফল হলে বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থা কতকটা হয়ে উঠত বর্তমান ভারত অধিকৃত কাশ্মিরেরই মতো।

দুর্গাপ্রসাদ দার ও পিএন হাক্সার সম্পর্কে বেশ কিছুটা জানা যায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জ্যাকোব লিখিত ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা বার্থ অফ ও ন্যাশন’ নামক বইতে। ১৯৭১ সালে জ্যাকব ছিলেন জগজিৎ সিং অরোরার অধীনে একজন মেজর জেনারেল। অরোরা ছিলেন শিখ। কিন্তু জ্যাকব হলেন ইহুদি। কেবল ইহুদিই নন, জায়োনিস্ট। তিনি তাজউদ্দীন সরকারের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করেন ইসরাইল সরকারের। তাজউদ্দীন সরকার ইসরাইল সরকারের সাথে বিশেষভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতে চান কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী এটা করতে বিশেষভাবে নিষেধ করেন। তাজউদ্দীন যে মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট ছিলেন সেটা জানা যায় বাংলাদেশের বিখ্যাত চীনপন্থী কমিউনিস্ট নেতা মোহাম্মদ তোয়াহার এক সাক্ষাৎকার থেকে। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৫ সালে চীন ও মস্কোপন্থীতে ভাগ হয়ে যায়।

এর আগে তোয়াহা এবং তাজউদ্দীন ছিলেন একই কমিউনিস্ট পার্টিতে। তোয়াহা বলেছেন, তাজউদ্দীন পূর্বাপর কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যদিও তাজউদ্দীন বাহ্যত আওয়ামী লীগ করতেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের সাথেই জড়িত ছিলেন। পার্টির সিদ্ধান্তেই তাকে আওয়ামী লীগে রাখা হয় (মহান একুশে সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থ : অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ২০০৮ সাল)। তাজউদ্দীন নিজের উদ্যোগে গিয়েছিলেন ভারতে। সাথী হিসেবে সেখানে পেয়েছিলেন দুর্গাপ্রসাদ দার ও পিএন হাক্সারকে।

এখন বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ খুব ঘটা করে বলছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপারটি ছিল একটা অতি জটিল রাজনৈতিক চক্রান্তের ফল। শেখ মুজিব তাই নানা কথা ভেবে যেতে চাননি ভারতে। যেতে চাননি ভারতে তার বন্ধু এবং সহযোগী ড. কামাল হোসেন।

ভারতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে একজনের মতামত আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। তিনি হলেন সোস্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার (S.U.C)-এর নেতা শিব দাস ঘোষ। তিনি তার এক পুস্তিকায় (১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৯ তারিখ) লিখেন : ‘… এ কথা কোনোমতেই ভুললে চলবে না যে, বাংলাদেশের এই জাতীয়তাবোধ পাকিস্তান জাতীয়তাবোধেরই একটি ধারা। … এ কথাও সাথে সাথে মনে রাখতে হবে যে, পূর্ব বাংলায় যে জাতীয় অভ্যুত্থান হয়েছে, পাকিস্তান জাতীয়তাবাদের মধ্যেই যেহেতু তার জন্ম, তাই এই জাতীয় অভ্যুত্থানের মধ্যে পাকিস্তান সম্বন্ধে দরদবোধ এবং মমতাবোধ পূর্ববাংলার মানুষের ভাবনায় আজও জড়িয়ে আছে।’

সোস্যাল ইউনিটি সেন্টার পশ্চিমবঙ্গে তখন বেশ একটা জোরালো সংগঠন ছিল। তাদের বক্তব্য মানুষ যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিচার করতেন। এরা মার্কসবাদী হলেও অন্য মার্কসবাদীদের মতো ছিলেন না। এদের বক্তব্য ছিল অনেক বস্তুনিষ্ঠ। ভারতের মস্কোপন্থী কমিউনিস্টরা ১৯৭১-এ ইন্দিরা গান্ধীকে সমর্থন দিচ্ছিল অন্ধভাবে।

অন্যদিকে সিপি (এম) এবং সিপি (এমএল) শেখ মুজিবকে বলছিল, মার্কিন এজেন্ট। কিন্তু এসইউসি এরকম কিছু বলছিল না। আবার শেখ মুজিবকে অন্ধভাবে যে সমর্থন করছিল, তাও নয়। তাদের মতে, পূর্ব বাংলায় যা ঘটছে তা আসলে হচ্ছে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদেরই একটা বাংলাভাষী রূপ। এখন আওয়ামী লীগ বলতে চাচ্ছে ১৯৭১-এর অভ্যুত্থান ছিল বিশুদ্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদের অভিব্যক্তি।

কিন্তু এসইউসি তা বলতে চায়নি। ২০১২ সালে বেরিয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী। যা প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। এতে শেখ মুজিব বলেছেন, বাংলাভাষী মুসলমানের জাতীয়তাবাদে আছে দু’টি দিক। একটি দিক হলা কেবলই বাঙালি কিন্তু আর একটি দিক হলো, তার সাথে লিপ্ত থাকা মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ। এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ আবার প্রাবল্য পেতে চাচ্ছে। আর এ জন্যই সম্ভবত ইসলামপন্থী বলে পরিচিতরা তাদের পক্ষে টানবে যথেষ্ট ভোট।

লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares