বই ও বইমেলা

আর মাত্র সাত দিন। তার পরই শুরু হয়ে যাবে ভাষার মাস, ভাষা আন্দোলনের মাস। সেই সাথে বাংলা একাডেমি চত্বরে ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুরু হবে আমাদের প্রাণের মেলা একুশে বইমেলা। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের বার্ষিক মিলনমেলা। সুন্দর সুন্দর স্টলে নানা বিষয়ের নানা রঙের হাজারো বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসবেন প্রকাশকরা। আসবেন লেখক ও পাঠকরা দলে দলে। প্রিয় লেখককে দেখতে, তার নতুন বই, অটোগ্রাফ সংগ্রহ করতে উন্মুখ হয়ে ছুটে আসবেন ভক্ত পাঠক। হয়তো বই নিয়ে খোদ লেখকের সাথেই আলোচনায় মেতে উঠবেন কোনো উৎসাহী পাঠক বা পাঠিকা। নতুন কবিতার বইটি সময়মতো বেরুল কি না, তা নিয়ে প্রকাশককে তাগাদা দিতে দিতে গলদঘর্ম হবেন কোনো তরুণ কবি। আর এভাবেই বইয়ের মেলা হয়ে উঠবে সত্যিকারের মিলনমেলা।

বাংলা একাডেমি চত্বরে চলবে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জীবন নিয়ে নানা আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিদিন প্রকাশ পাবে অনেক বই। মানুষ ঘুরে ঘুরে বই দেখবে, কিনবে, পড়বে। ব্যাগে ঝুলিয়ে বাড়ি নিয়ে যাবে। দেখবে কাগজের বুকে কালো কালির অক্ষরে মুদ্রিত জীবনের রূপ, জীবনবোধের বিমূর্ত প্রকাশ। জীবন ও জগৎকে নতুন করে দেখার, উপলব্ধি করার নতুন চোখ হয়তো খুলে যাবে কোনো পাঠকের। এক মাসের জন্য ঢাকা হয়ে উঠবে বইয়ের নগরী। এই মেলায় প্রকাশিত হবে বছরের সর্বোচ্চ সংখ্যক বই। প্রকাশক ও লেখকরা এই মেলা সামনে রেখেই তাদের বই প্রকাশের চিন্তা করেন। কারণ এক সাথে এত ক্রেতা ও পাঠক বছরের আর কোনো সময় পাওয়ার সুযোগ নেই। তাই বেশি বই প্রকাশ ও বিক্রির ফলে মানুষের যেটুকু পাঠের অভ্যাস এখনো আছে, তা কিছুটা ঝালাই হবে। সৃষ্টি হবে নতুন লেখক, পাঠক-পাঠিকা। জাতির উন্নয়নের একটি প্রয়োজনীয় শর্ত এভাবেই বাস্তবে রূপায়িত হয়ে উঠবে।

আমাদের দেশে সাধারণত এই ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বইমেলা আর বই নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন বেশির ভাগ প্রকাশক, লেখক ও পাঠকেরা। বাকি সারা বছর তেমন একটা সাড়া পড়ে না বই নিয়ে। যদিও একুশে বইমেলা ছাড়াও রাজধানীতে বছরের বিভিন্ন সময়ে আয়োজন করা হয় আরো বেশ কয়েকটি বইমেলার। সেগুলোর প্রতি তেমন একটা আগ্রহ দেখা যায় না পাঠকের। অনেক সময় প্রচার-প্রচারণার অভাবে অন্যান্য বইমেলার খবর পাঠকদের কাছে খুব একটা পৌঁছায়ও না। ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা, হেমন্তের বইমেলা, বর্ষার বইমেলাসহ বছরে যে গোটা পাঁচেক বইমেলার আয়োজন হয়, তার খবর ক’জন পাঠকইবা রাখেন?
কিন্তু বই ও বইয়ের মেলা একটি জাতির জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বই পড়া ছাড়া কোনো জাতি উন্নত হতে পারে না, এই পুরনো কথাটা সবাই জানেন। কিন্তু আমাদের সমাজে এর তেমন প্রতিফলন নেই। যেটুকু আছে সেটুকু সৃষ্টিতে একুশে বইমেলার বিশেষ অবদান আছে, এটা বলতেই হবে।
এ প্রসঙ্গে আমরা একনজরে একুশে বইমেলার ইতিহাস এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজিত বইয়ের মেলা নিয়ে জেনে নিতে পারি কিছু তথ্য।

একুশের গ্রন্থমলা
একুশের বইমেলার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন অনেকে। তাদের স্মৃতি ধরে রাখতেই এই মেলার নাম দেয়া হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা। ১৯৭২ সালে মুক্তধারা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের সামনের বটতলায় তার প্রকাশনীর বই বিছিয়ে বসেন। সে সময় মুক্তধারার ছিল মাত্র ৩২টি বই। বইগুলো ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রিত বাংলাদেশের শরণার্থী লেখকদের লেখা। সে বছর বাংলা একাডেমিও একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বিশেষ মূল্য ছাড়ের মাধ্যমে তাদের বই বিক্রি করে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে জমে উঠতে শুরু করে বইয়ের মেলা।

১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমি এ মেলার স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি যুক্ত হয় মেলার সাথে। ১৯৭৯ সালে বইমেলার সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। তার পর থেকে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বইমেলা। কিন্তু ধীরে ধীরে মেলা নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ায় মেলার সময় বাড়ানো হয়। এখন ফেব্রুয়ারিজুড়েই চলে একুশের গ্রন্থমেলা। এবার তৃতীয় বছরের মতো বইমেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণসহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজন করা হচ্ছে।
বইয়ের ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও মুদ্রিত বইয়ের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। প্রথম মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হয় ১৫৫৪ সালে জার্মানির ফ্রাংকফুর্টে। আর তখন থেকেই ছাপানো বই মানুষের হাতে আসে। সম্ভবত ওই বছর বা তার পরের বছর মুদ্রিত বইয়ের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় ওই ফ্রাংকফুর্ট শহরে। এটাই হলো বিশ্বের প্রথম বইয়ের মেলা।

ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা
এটি বিশ্বের প্রাচীনতম বইমেলা। মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারক ইয়োহানেস গুটেনবার্গ তার আবিষ্কৃত ছাপাখানার যন্ত্রাংশ এবং ছাপানো বই বিক্রির জন্য ফ্রাংকফুর্টে আসেন। গুটেনবার্গের দেখাদেখি ফ্রাংকফুর্ট শহরের স্থানীয় কিছু বই বিক্রেতাও তাদের প্রকাশিত বই নিয়ে বসতে থাকেন। আর এগুলো কিনতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষও আসতে শুরু করে। এভাবেই জমে ওঠে ফ্রাংকফুর্টের বইমেলা। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বইমেলা। এ মেলার সময়কাল পাঁচ দিন। কিন্তু সারা বিশ্বের হাজার হাজার প্রকাশক, বিক্রেতা, লেখক, পাঠক, দর্শক ও সাংবাদিকের অংশগ্রহণে মুখরিত হয়ে ওঠে মেলা।

লন্ডন বইমেলা
প্রকাশনার দিক থেকে লন্ডন বইমেলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলাগুলোর একটি। ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার মতো বড় না হলেও এ মেলার গুরুত্ব অনেক। গত বছর এ মেলায় বিশ্বের একশরও বেশি দেশ থেকে ২৩ হাজার প্রকাশক, বই বিক্রেতা, সাহিত্য প্রতিনিধি, লাইব্রেরিয়ান, সংবাদমাধ্যমকর্মী অংশ নিয়েছিলেন। প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রচারের জন্য এবং অন্য প্রকাশক থেকে বইয়ের স্বত্ব অথবা বইয়ের অনুবাদ স্বত্ব কেনা-বেচার জন্য প্রকাশকেরা এ মেলায় অংশ নেন। ফ্রাংকফুর্টের বইমেলার সাথে এ মেলার বড় পার্থক্য হলো- এটি আসলে প্রকাশকদের মেলা। এখানে সাধারণ পাঠকের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে।

কলকাতা বইমেলা
ফ্রাংকফুর্ট এবং লন্ডন বইমেলার পরের স্থানটি কলকাতা বইমেলার। সে হিসেবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বইমেলা এটি। মেলা শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। মেলা অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারির শেষ বুধবার থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম রোববার পর্যন্ত। সব মিলিয়ে মেলার মেয়াদ ১২ দিন। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, মেলায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষের সমাগম হয়।

ফ্রাংকফুর্ট এবং লন্ডন এ দু’টি বইমেলার সাথে কলকাতার বইমেলার পার্থক্য হলো- এখানে পাঠকদের গুরুত্ব দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। ব্যবসা নয়, পাঠক সৃষ্টিই এ মেলার মূল উদ্দেশ্য।
পাঠক সৃষ্টি, এটাই বইমেলার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। বেঁচে থাকার জন্য খাবার খাওয়া যেমন মানবদেহের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু খেয়ে বেঁচে থাকাই মানুষের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হতে পারে না। স্রষ্টার স্মরণ, মানুষের কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বর্তমান পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে যাওয়াই হলো মানব জীবনের লক্ষ্য। তেমনি বইয়ের ব্যবসা নিঃসন্দেহে প্রকাশকের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বই প্রকাশের মূল লক্ষ্য হলো মানুষ যাতে পড়তে পারে, জানতে পারে, জ্ঞানার্জন করতে পারে সেই সুযোগ করে দেয়া অর্থাৎ পাঠক সৃষ্টি।

বইমেলার কারণেই দেশে বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহের একটা জায়গা ক্রমেই সৃষ্টি হচ্ছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা চাই মানুষ বই পড়–ক, মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়–ক। মানুষ প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে উঠুক।

একজন বিশিষ্ট লেখক একবার কাগজে লিখেছিলেন, ‘আমি বই পড়ি না।’ তারপর সেই কাগজটা একটা গরুর গায়ে সেঁটে দিয়েছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, যে লোক বই পড়ে না, সে গরুর মতোই নির্বোধ। মানুষকে ‘মানুষ’ হতে হলে তাকে গরু-ছাগলের জীবন থেকে উঠে আসতে হবে। বই পড়ার গুরুত্বটুকু উপলব্ধি করতে হবে। বই পড়তে হবে।
আমাদের গায়ে কেউ যেন ‘আমি বই পড়ি না’ লেখা পোস্টার সেঁটে দিতে না পারে! তাই বই হোক আমাদের নিত্যসঙ্গী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বাগতম

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমাদের পথচলা

অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ সারদিন এর সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

shares